জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:

কক্সবাজারের টেকনাফে একটি সরকারি জমি ও পরিত্যক্ত ভবন দখলের অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশ্যে সরকারি ভবন ও জমি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দখলে জড়িত ব্যক্তিরা বিএনপির অঙ্গসংগঠনের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

এ ঘটনায় জমিদাতার উত্তরাধিকারী এবং স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত সরকারি জমি ও ভবন দখলমুক্ত করে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের নাটমুরাপাড়া এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি কমিউনিটি সেন্টার দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশ বিভাগের পর তৎকালীন ইউপি সদস্য আলহাজ মো. ইসমাইল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা প্রশাসকের অনুকূলে ৮ শতক (২৪ কড়া) জমি দান করেন। ওই দানকৃত জমিতেই সরকার ইউনিয়ন কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করে।

ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দিয়ারা-২ নম্বর খতিয়ানের ১২২০২ নম্বর দাগে ০.০৮০০ একর জমি ‘হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদ অফিস/গণস্বাস্থ্য অফিস’ হিসেবে সরকারি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ আব্দুস সোবহান জানান, তাঁর চাচা ইসমাইল মেম্বার সরকারের নামে জমিটি দান করেছিলেন। পরে সেখানে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত থাকলেও সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি সেটি দখল করে নিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল গণি বলেন, “এটি দানকৃত সরকারি সম্পত্তি। বর্তমানে কিছু লোক বেড়া দিয়ে দখলের চেষ্টা করছে। বিষয়টি রোধে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

একই এলাকার মোহাম্মদ হোছন ও মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা জনগণের কল্যাণে সরকারকে জমিটি দান করেছিলেন। এটি সরকারি সম্পত্তি। এখানে হাসপাতাল, ডাক্তারখানা বা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে।”

জমিদাতার ছেলে, প্রবীণ বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য জাফর আলম চৌধুরী বলেন, “আমার বাবা সরকারের ব্যবহারের জন্য জমিটি দান করেছিলেন। এটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবেই থাকবে। অন্য কেউ দখল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজন হলে দাতার উত্তরাধিকারীরা এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্থানীয় যুবদল নেতা নুর হোসনের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) টেকনাফ উপজেলা আহ্বায়ক সায়েম সিকদার বলেন, “সরকারি কমিউনিটি সেন্টার জবরদখল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে-ই হোক, সরকারি বা বিরোধী দলের—আইন মেনেই সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করতে হবে।”

এ বিষয়ে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, “সরকারি সম্পত্তি লিজ দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। তবে পরিত্যক্ত ভবনটি যাতে মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত না হয় এবং বেদখল না হয়, সে বিবেচনায় স্থানীয় যুবদল কর্মী নুর হোসনকে মাসিক ভিত্তিতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে স্থাপনায় কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সম্প্রসারণের অনুমতি নেই।”

ইউপি সচিব মো. নুরুল হুদা বলেন, “নামমাত্র চুক্তির ভিত্তিতে একজন স্থানীয় ব্যক্তিকে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, ভবনটি যাতে মাদকের আস্তানা বা দখলের শিকার না হয়।”

তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ কেবল পরিষদের সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এবং বিধি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারি সম্পত্তি ইজারা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজস্ব খাতে অর্থ জমা দেওয়াও বাধ্যতামূলক। অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “সরকারি জমি দখলের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”